খাদ্যের প্রকারভেদ

আজকের আলোচনার বিষয় খাদ্যের প্রকারভেদ। যা পেশেন্ট কেয়ার টেকনিক ১ এর খাদ্য ও পুষ্টির প্রাথমিক ধারণার প্রয়োগ অংশের অন্তর্গত।

 

খাদ্যের প্রকারভেদ

 

খাদ্যের প্রকারভেদ

খাদ্য (Food)

খাদ্য হল তরল, অর্ধতরল বা কঠিন যেকোনো কিছু, যা পুষ্টি এবং শক্তি ধারণ করে এবং যা খাওয়া হলে শরীরে পুষ্টি যোগায়। খাদ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ রয়েছে যা চলাফেরা, চিন্তাশক্তি, দৈনন্দিন জীবনের কাজ ও আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ অব্যাহত রাখতে, আমাদের সুস্থ রাখতে, আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। যখন আমরা খাদ্য গ্রহণ করি, তখন আমাদের শরীরে রক্তে দরকারী পুষ্টি শোষণ করে এবং সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষণ করে। সুতরাং, যে কোনো দ্রব্যকে খাদ্য বলতে হলে তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, তা হলো খাওয়ার যোগ্য হতে হবে এবং তা শরীরে পুষ্টি যোগাবে।

খাদ্যের প্রকারভেদ:

খাদ্যের গ্রুপ, উৎস এবং কাজ অনুসারে খাদ্যকে বিভিন্নভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়। নিম্নের সারণী থেকে আমরা খাদ্যের বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে জানব।

 

শক্তি প্রদানকারী খাবার (কার্বোহাইড্রেট/শর্করা এবং লিপিড/স্নেহ):

আমাদের প্রতিদিনের কাজ যেমন চলাফেরা, পড়াশুনা, খাওয়া-দাওয়া, ঘরে বা বাইরে কাজ করার জন্য শক্তি প্রয়োজন। আমরা যা খাই, তা থেকে এই শক্তি পাই। এমনকি আমরা যখন বিশ্রাম করি তখনও শক্তির প্রয়োজন আছে। বলতে পারবে কি এমনটা কেন? আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সর্বদা কাজ করে, যেমন, হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করছে, পাকস্থলী খাবার হজম করছে, ফুসফুস শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে ইত্যাদি। এই সমস্ত অঙ্গগুলোর নিজ নিজ কাজের জন্য শক্তি প্রয়োজন, আর খাদ্য সেই শক্তি জোগায়।

 

খাদ্যের প্রকারভেদ

 

কার্বোহাইড্রেট/শর্করা:

শস্যদানা

মাটির নিচের সঙ্গী

ফল

সাদা চাল, ঢেঁকিছাটা চাল, চালের আটা, ঢেঁকিছাটা গমের আটা ও ময়দা (বাদামী), সাদা গমের আটা ও ময়দা, ভুট্টার তৈরি খাবার আলু

মিষ্টি আলু

কুমড়া

কলা

আম

কাঁঠাল

 

 

লিপিড/স্নেহ:

স্যাচুরেটেড

আনস্যাচুরেটেড

প্রাণী উৎস: ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য মোখন, পনির, টক দই, দই), প্রাণীর (গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, চর্বি, মগজ, মাছের তেল
উদ্ভিদ উৎস : বাগামের মাখন, নারকেল উদ্ভিদ উৎস: সূর্যমুখী তেল, সয়াবিন, ভুট্টার ভেল, তিলের তেল, বাদামের তেল, জলপাই- এর তেল, পাম তেল

 

খাদ্যের প্রকারভেদ

 

শরীর গঠনকারী খাবার (প্রোটিন):

তুমি কি কখনও ভেবে দেখেছো কিভাবে একটি ছোট শিশু বড় হয়? আমাদের শরীর হাজার হাজার ছোট কোষ | দ্বারা গঠিত। শরীরের বৃদ্ধিতে সাহায্য করার জন্য কোষ বিভাজন হয় এবং নতুন কোষ তৈরি হয়। নতুন কোষ গঠনের জন্য খাদ্য প্রয়োজন। আমাদের জীবদ্দশায় কিছু কোষ মারাও যেতে পারে বা আঘাতের কারণে ক্ষতিগ্র হতে পারে। এই কোষগুলো প্রতিস্থাপনের কাজ খাদ্যের মাধ্যমেই হয়।

প্রাণী উৎস: উদ্ভিদ উৎস :
গৃহপালিত পশু: গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগির মাংস ও কলিজা; বিভিন্ন ধরনের মাছ, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য মোখন, পনির, টক দই, দই) শস্যদানা: বিভিন্ন ধরনের ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, সীমের বিচি, সয়াবিন প্রক্রিয়াজাত সরা পণ্য সা দুধ, সা মরদা; বাদান এবং বীজ: বিভিন্ন ধরনের ৰাদাম, তিল

 

 

খাদ্যের প্রকারভেদ

 

প্রতিরক্ষামূলক খাবার (ভিটামিন ও মিনারেলস/খনিজ পদার্থ):

শরীরের বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের শরীরের | স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬০ ফারেনহাইট। একইভাবে, হৃদস্পন্দনও ৬০ থেকে ১০০ বীট/মিনিটে বজায় রাখতে হয়। শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ নিয়মিত নির্গমন নিশ্চিত করতে হয়। তা না হলে কোষ্ঠকাঠিন্য সহ অন্যান্য | জটিলতা শরীরে বাসা বাধে। এই সমস্ত প্রক্রিয়া অনাদের গ্রহণ করা খাবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা সারাদিন যে খাবার খাই তা আমাদের রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি দেয়।

যে খনিজ উপাদান অধিক পরিমাণে প্রয়োজন, সেগুলোকেই ম্যাক্রোমিনারেল বলে। যেমন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম।

সবজি ফল
সবুজ শাক-সবজি: পুঁই শাক, পালং শাক, কুমড়া পাতা, ব্রকলি, লেটুস, সবুজ মটরশুটি, সবুজ মরিচ

লাল এবং কমলা সবজি: গাজর, কুমড়া, লাল মরিচ, মিষ্টি আলু, টমেটো

অন্যান্য সবজি: অপরিণত ভুট্টা, বীটের শিকড়, বাধাকপি, বেগুন, শসা, ফুলকপি, মাশরুম, পেঁয়াজ

কলা, আনারস, পেঁপে, আম, জাম, পেয়ারা, কমলা, কাঁঠাল, জামরুল, লেবু, আপেল, ফেল, অ্যাভোকাডো, তরমুজ, জাম্বুরা, তেঁতুল, বেরি ইত্যাদি।

 

ক্যালসিয়াম:

আমাদের শরীরে ক্যালসিয়ামের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১০০০ মিলিগ্রাম। হাড় ও দাঁত মজবুত রাখা ছাড়াও নিয়ন্ত্রিত রক্তপ্রবাহ, মাংসপেশির কার্যক্রম, গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরিতে ক্যালসিয়াম কাজ করে। দুধ, দই, পনির ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উৎস। এ ছাড়া পালংশাক, কালো ও সবুজ কচুশাক, শজনেপাতা, পুদিনাপাতা, শর্ষেশাক, কুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, ঢ্যাঁড়স, বাঁধাকপি, ব্রুকলির মতো বিভিন্ন সবজি এবং কমলা, ডুমুর, আঙুর, কিশমিশ, ড্রাইফ্রুট, তরমুজ, বিটরুট, সয়াবিন, তিল, কাঁচা বাদাম, আখরোট, সামুদ্রিক ও কাঁটাসহ ছোট মাছ ও চিংড়ি শুঁটকিতে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম রয়েছে। শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে দাঁত-হাড়ের ক্ষয়রোগসহ মস্তিষ্কের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পটাশিয়াম:

কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন বিপাকের জন্য পটাশিয়াম খুবই জরুরি। এটি বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজন। শুধু তা–ই নয়, এটি রক্তের পিএইচ লেভেল ও দেহের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন ৩৫০০-৪৭০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়ামের প্রয়োজন। কলা, কমলা, আঙুর, ড্রাইফ্রুট, কিশমিশ, খেজুর, পালংশাক ও ব্রুকলি, গোল সাদা আলু, মিষ্টি আলু, বিট, মাশরুম, মটরশুঁটি, শসা, রসুন, দুধ, সাদা মুলা ও লাল মাংসে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। পটাশিয়ামের অভাবে মাংসপেশি দুর্বল হতে পারে। কমে যেতে পারে প্রজননক্ষমতা।

ফসফরাস:

রক্তে পিএইচের মাত্রা ঠিক রাখতে নিউক্লিক অ্যাসিড, ফসফোলিপিড ও বিভিন্ন এনজাইমের কো-ফ্যাক্টর হিসেবে দরকার ফসফরাস। শর্করা ও চর্বিজাতীয় খাবার বিপাক, দেহকোষ ও টিস্যুর ক্ষত সারানো ও রক্ষণাবেক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৮০০ মিলিগ্রাম ফসফরাস। সাধারণত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার হাঁস–মুরগির মাংস, ডিম, সামুদ্রিক মাছ, বীজজাতীয় খাবার, ডাল, বাদাম, দুধ, পনির, খেজুর ইত্যাদি থেকে প্রচুর ফসফরাস পাওয়া যায়।

ম্যাগনেশিয়াম:

ম্যাগনেশিয়াম অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে নতুন ধরনের প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে। ডিএনএ ও আরএনএর পুনর্গঠন, মাংসপেশির সংকোচন-প্রসারণ নিয়ন্ত্রণসহ রক্তের গ্লুকোজ কোষে পৌঁছাতে সাহায্য করে। বয়সভেদে ম্যাগনেশিয়ামের চাহিদা ৩০০-৪০০ মিলিগ্রামের মধ্যে হয়ে থাকে। পূর্ণশস্যজাতীয় খাবার, বাদাম, বীজজাতীয় খাবার, তফু, চর্বিযুক্ত মাছ, কলা, পালংশাক, খোসাসহ আলু ও ঢ্যাঁড়স ম্যাগনেশিয়ামের ভালো উৎস।

Leave a Comment