হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ

আজকে আমরা  হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা পেশেন্ট কেয়ার টেকনিক ১ এর কমিউনিকেশন এন্ড কাউন্সেলিং অংশের অন্তর্গত।

 

 হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ

 

 হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ

সমন্বিত, উচ্চ-মানের যত্ন বা সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা দলের সদস্যদের অবশ্যই একে অপরের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে হবে। কেয়ারগিভার হিসেবে তুমি তোমার প্রাত্যহিক সেবা দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করার মতো অবস্থানে রয়েছো। এই সকল তথ্য ঠিক কিভাবে রেকর্ড ও প্রতিবেদন করবে সে বিষয়ে অবশ্যই ধারণা থাকতে হবে যাতে করে  হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের অন্যান্য সদস্যরা প্রয়োজন মত সেই তথ্য গুলো সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি, কোনো কঠিন বা জটিল পরিস্থিতিতে রোগীর অবস্থা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার প্রয়োজন হতে পারে।

হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ বলতে মূলত এই বিষয়গুলোকেই বুঝানো হয়। প্রথম অধ্যায় থেকে আমরা ইতোমধ্যেই হেল্থ কেয়ার টীম বা স্বাস্থ্য সেবা দল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করেছি। এক্ষেত্রে যোগাযোগটা মূলত পেশাগত যোগাযোগ। তাই এপ্রোচটাই হতে হয় পেশাগত ও আনুষ্ঠানিক।

সাধারণত নির্দিষ্ট কতগুলো উপায়ে এই যোগাযোগটি সংঘটিত হয়ে থাকে। যেমন; ডেইলি রেকর্ড ও রিপোর্ট, গুরুত্বপূর্ণ ফর্মস, কেয়ারপ্ল্যান, ফ্লো শীট, কেয়ার নোট্স, পেশেন্ট ফাইল ইত্যদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর তাই এই বিষয়গুলো সম্পর্কে একজনে কেয়ারগিভারের অবশ্যই ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। নিচে  হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কেয়ারগিভারের জন্য প্রযোজ্য অত্যাবশ্যকীয় যোগাযোগের মৌলিক কিছু নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করা হল।

 

১। চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিচিত শব্দ ও সংক্ষিপ্ত রূপঃ

স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কাজ করতে গেলে কেয়ারগিভারকে অবশ্যই কিছু সুপরিচিত মেডিক্যাল শব্দ ও পরিভাষা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য নতুন মেডিক্যাল পরিভাষা মনে রাখা কঠিন লাগাটা খুবই স্বাভাবিক। কেননা, মেডিক্যাল পরিভাষার কিছু কিছু শব্দ অনেক দীর্ঘ, কিছু কিছু আছে উচ্চারন ও বানান করাই অনেক কষ্টসাধ্য আবার অনেক গুলো আছে যেগুলো সচরাচর কথাবার্তায় একদমই ব্যবহৃত হয়না। মেডিক্যাল পরিভাষা সম্পর্কে ২য় অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

২। রিপোর্টিং:

রিপোর্টিং হচ্ছে  হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সদস্যদের মধ্যে লিখিত বা মৌখিকভাবে তথ্যের আদান- প্রদান। সাধারণত কেয়ারগিভার শিফটের শুরুতে ও শেষে তার কেয়ার সুপারভাইজর বা ইনচার্জের কাছে রিপোর্ট করে থাকে। যেহেতু কেয়ারগিভার সবচেয়ে বেশি সময় অসুস্থ ব্যক্তির সাথে অতিবাহত করেন, তাই কেয়ারগিভারই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারেন। রোগীর পরিবর্তন গুলো জানার পরে সেই সম্পর্কিত তথ্যাদি স্বাস্থ্য সেবা কাজে নিয়োজিত দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছে যোগাযোগ করার জন্য মূলত দুইটি উপায়ে।

৩। অবজেকটিভ অবজার্ভেশন বা উদ্দেশ্যমূলক পর্যবেক্ষনঃ

একজন ব্যক্তি যদি তার যেকোনো একটি সেন্সরি অরগান ব্যবহার করে কোনো তথ্য নিজে সরাসরি উদ্ঘাটন করে তখন তাকে উদ্দেশ্যমূলক পর্যবেক্ষণ বলে। যেমন: রোগীর শরীরের তাপমাত্রা কম, বেশী নাকি স্বাভাবিক; অথবা চামড়া অতিরিক্ত শুকনো কিনা অথবা শরীরের রক্তচাপের পরিমাপ কত। এইসকল পর্যবেক্ষণ যদি কেয়ারগিভার নিজে নির্নয় করে থাকে, তখন তাকে উদ্দেশ্যমূলক বা অবজেক্টিভ অবসার্ভেশন সংঘটিত হয়।

 

 হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ

 

৪। বিষয়গত পর্যবেক্ষণ বা সাবজেক্টিভ অবজার্ভেশনঃ

যে সমস্ত তথ্য ও উপাত্ত নিজের সেন্সরি অরগানের সাহায্যে সরাসরি পরিমাপ করা যায়না বা কোনো যন্ত্রপাতির সাহায্যে মাপা যায়না সেগুলো হল সাবজেক্টিভ অবসার্ভেশন। যেমন, একজন ব্যক্তি তার মাথা ব্যথা বা যন্ত্রনার কথা আপনাকে বলতে পারেন অথবা বলতে পারেন তার সারারাত অনিদ্রা থাকার বিষয়ে। যেহেতু এই তথ্যাদি মেপে দেখার কোনো সুযোগ নাই, রোগী বা ক্লায়েন্টের কথার উপরই নির্ভর করতে হয়, তাই এগুলো হলো সাবজেক্টিভ তথ্যাদি।

এ সমস্ত ক্ষেত্রে গৃহীত তথ্য ও উপাত্তের মধ্যে কোনো কোনো বষয়গুলো রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে সেটি নির্দেশনা অনুযায়ী করতে হবে। তবে সাধারণত নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।

  • মুড বা মন-মেজাজ
  • মানসিক সচেতনতা
  • লেভেল অফ ইনডেপেনডেন্স বা স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা
  • আচার-আচরণ
  • ভাইটাল সাইন্স
  • প্রস্রাব বা পায়খানা সম্পর্কিত তথ্য।
  • স্কিন বা চামড়ার অবস্থা ও রং
  •  ক্ষুধা ও খাদ্যাভ্যাস
  • ঘুমের অভ্যাস
  • কমফোর্ট লেভেল অর্থাৎ, রোগী কতটা আরামদায়ক অনুভব করছেন।

দৃশ্যকল্পঃ

মিসেস রহিমা ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত। আজ সকালে কেয়ারগিভার যখন তার সকালের কাজে কর্মে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন, তখন তিনি একটি ব্রাশ তুলে তার দিকে ছুঁড়ে মেরে চিৎকার করে বললেন, “বেরিয়ে যাও!” সাধারণত ঐ কেয়ারগিভারকে মিসেস রহিমা তার সেবাদানের ক্ষেত্রে সহযোগীতা করে থাকে।

এখন এক্ষেত্রে রোগীর আচরণের এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন কেয়ার সুপারভাইজার বা সংশ্লিষ্ট অন্য কারো কাছে জানানোর জন্য কেয়ারগিভারকে কার্যকর যোগাযোগের দক্ষতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করতে হবে। যেমন, ইতিবাচক ভাবে লিখিত বা মৌখিক রিপোর্টিং-এর ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, “আজ সকালে আমি যখন মিসেস রহিমাকে পোশাক পরিধানে সাহায্য করার চেষ্টা করছিলাম তখন তিনি তার চুল আচড়ানোর ব্রাশটি তুলে আমার দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং আমাকে বাইরে যেতে বললেন। তবে তিনি সাধারণত এই ধরনের আচরণ করেননা।” আবার, কম কার্যকরীভাবে বলা যায় “মিসেস রহিমা আমাকে আজ সকালে চুল আচড়ানোর ব্রাশ দিয়ে আঘাত করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন।”

 

 হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ

 

৫। রেকর্ডিং বা ডকুমেনটেশন বা নথীকরনঃ

এটি  হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ করার একটি প্রধানতম উপায়। রুটিন বা প্রাত্যহিক সেবা দানের কার্যাবলি থেকে শুরু করে বিশেষ কোনো ঘটনা বা অবস্থা সবই আসতে পারে এর ভিতর। এক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি ফর্ম বা তথ্য লিপিবদ্ধকরণের নির্দিষ্ট নথি হতে পারে নিম্নরুপঃ

  • কেয়ারপ্ল্যান
  •  ইনটেক-আউটপুট চার্ট
  • ভাইটাল সাইন লিপিবদ্ধকরণের ফর্ম
  • হ্যান্ডওভার বা দ্বায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য ব্যবহৃত নমুনা ফর্ম
  • ডায়েট চার্ট প্রভৃতি।

 

 হ্যাল্‌থ কেয়ার টীমের সাথে যোগাযোগ

 

৬। মোবাইল ফোনে কথা বলাঃ

আধুনিক যুগে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ খুবই নৈমত্তিক একটি বিষয়। নানবিধ উপযোগীতার কারণে এটি এখন সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু, মোবাইল ফোনে কথা বলার কিছু নিয়ম-কানুন ও শিষ্ঠাচার রয়েছে। এগুলো রোগী বা ক্লায়েন্ট, তার পরিবার, সহকর্মী তথা যে কারো সাথে মোবাইলে কথা বলার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

  • পেশাদার হতে হবে। আউটগোইয়িং কল করা, ইনকামিং কলগুলোর উত্তর দিতে, কাউকে অপেক্ষায় রাখতে, কল স্থানান্তর করতে এবং অন্য কোনোও বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করতে কীভাবে টেলিফোন সিস্টেমটি ব্যবহার করবে তা ভালোভাবে জেনে নিতে হবে।
  • নিজের পরিচয় সঠিকভাবে আগে দেওয়ার চেষ্টা কর। তুমি যখন টেলিফোনের উত্তর দাও তখন কলকারীকে অভিবাদন জানিয়ে তোমার নাম, পদবী এবং যেখানে কাজ করছো সেটা বলে কীভাবে সহায়তা করতে পারো তা জিজ্ঞাসা কর (উদাহরণস্বরূপ, “হ্যালো, রুবিনা বলছি, কেয়ারগিভার, এবিসি হোম কেয়ার। কীভাবে সহায়তা করতে পারি? যখন তুমি নিজে কল করছো, তখন ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করা মাত্রই অভিবাদন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিন।
  • নম্র ব্যবহার কর। ফোনটি বেজে উঠার সাথে সাথেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা কর। আস্তে আস্তে এবং স্পষ্টভাবে কথা বল, মনোরম সুরে। যদি কোনোও কলারকে হোল্ডে রাখতে হয় তবে এটি অল্প সময়ের জন্য কর। যদি অপেক্ষাটি এক মিনিটেরও বেশি দীর্ঘ হবে বলে মনে হয় তবে আগেই অনুমতি নিয়ে নাও।
  • সঠিক বার্তা নাও। যদি কোনোও বার্তা নিতে বলা হয় তবে তা সাবধানে লিখ এবং পুনরাবৃত্তি কর যাতে তথ্যটি সঠিক কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়। বার্তাটি সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা। কোনোও ভুল হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে, বার্তা দেওয়ার আগে তুমি কী লিখেছো তা পরীক্ষা করে দেখ।
  • গোপনীয়তা বজায় রাখ। কলকারীরা কারও স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারে বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য অনুরোধ করতে পারে। সচেতন থাক এমনকি কোনোও ব্যক্তি বাসায় নাকি বৃদ্ধাশ্রমে কোথায় সেবা নিচ্ছে নিজে থেকে সেটি বলাও গোপনীয়তা ভঙ্গের কারণ বলে বিবেচিত হতে পারে। নিয়োগকর্তার অনুমতি ব্যাতিত কোনো তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে না। কলকারীকে কী তথ্য সরবরাহ করতে হবে সে সম্পর্কে যদি অনিশ্চিত থাক তবে সুপারভাইজারকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।

Leave a Comment