আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় শারীরিক অক্ষমতায় ব্যবহৃত সহায়ক যন্ত্ৰ – যা শারীরিক অক্ষমতায় ব্যবহৃত পরিপুরক উপকরণ ব্যবহার সহায়তা এর অন্তর্ভুক্ত।
শারীরিক অক্ষমতায় ব্যবহৃত সহায়ক যন্ত্ৰ
শারীরিক অক্ষমতায় ব্যবহৃত সহায়ক যন্ত্রগুলোকে গতিশীলতা সহায়ক যন্ত্রও বলা যায়। যেমন হুইলচেয়ার, ওয়াকার, ক্রাচ, মেডিকেল বেড এবং অর্থোটিক ডিভাইস।
হুইলচেয়ার:
হুইলচেয়ার হল চাকা সহ একটি চেয়ার যা অসুস্থতা, আঘাত, বার্ধক্যজনিত সমস্যা বা অক্ষমতার কারণে চলাফেরায় সমস্যা বা তা অসম্ভব হলে ব্যবহৃত হয়। হুইলচেয়ারগুলো তাদের ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন ধরনের ফর্ম্যাটে আসে।
এগুলোতে বিশেষ বসার অভিযোজন, স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে এবং স্পোর্টস হুইলচেয়ারগুলোর বিশেষ কার্যকলাপের জন্য নির্দিষ্ট হতে পারে। ব্যবহারকারী নিজে বা সাহায্যকারী কেউ বল প্রয়োগ করে ম্যানুয়াল হুইলচেয়ার চালায়। মোটর চালিত হুইলচেয়ারগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এগুলো ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

মেডিকেল বেড
একটি মেডিকেল বেড হল একটি বিছানা যা বিশেষভাবে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য বা যাদের কিছু বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন তাদের জন্য ব্যবহার করা হয়। রোগীর আরাম ও সুস্থতার জন্য এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুবিধার জন্য এই বিছানাগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
সাধারণত এর অংশগুলোর মধ্যে আছে বিছানা, মাথা এবং পায়ের জন্য উচ্চতার সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা, সামঞ্জস্যযোগ্য পার্শ্ব রেল, এবং মেডিকেল বেডের সকল কার্যকারিতার ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল। মেডিকেল বেডের কার্যকারিতা এবং শক্তির উৎসের উপর ভিত্তি করে এগুলো তিন ধরনের
- ম্যানুয়াল বেড
- সেমি ইলেক্ট্রনিক বেড
- পূর্ণ ইলেক্ট্ৰনিক ৰেড


বৈশিষ্ট্য
- চাকা চাকাগুলো বিছানার সহজ নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। চাকা লক করা যায়। নিরাপত্তার জন্য, রোগীকে বিছানায় বা বাইরে স্থানান্তর করার সময় চাকা লক করে নিতে হয় ।
- মাথা এবং পায়ের জন্য উচ্চতার সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা: বিছানার মাথা ও পায়ের অংশ সম্পূর্ণ উচ্চতায় উঠানো ও নামানো যায়। বর্তমানে, সেমি ইলেক্ট্রনিক ও সম্পূর্ণ ইলেক্ট্রনিক বিছানার এই বৈশিষ্ট্যগুলো দুটি মোটর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
- সামঞ্জস্যযোগ্য পার্শ্ব রেল: বিছানার পাশে রেল আছে যা উঠানো বা নামানো যায়। এই রেলগুলো রোগীর জন্য সুরক্ষা হিসাবে কাজ করে। এগুলো যদি সঠিকভাবে নির্মিত না হয় তাহলে রোগীর পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- ডানে-বামে কাত করার ব্যবস্থা: কিছু উন্নত বিছানা প্রতি পাশে ১৫-৩০ ডিগ্রীতে কাত করা যায়। এই ধরনের ব্যবস্থা রোগীর দেহে প্রেসার আলসার প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
প্রাত্যহিক পরিচর্যা:
১. বিছানা এবং গদি প্রতিদিন পরীক্ষা এবং পরিষ্কার করা উচিত। রোগী যখন বিছানায় থাকবে না তখন এটা করতে হবে। যদি এটি সম্ভব না হয় তবে রোগীকে ব্যাখ্যা করতে হবে যে কি করা হচ্ছে।
২. হাত ধুয়ে একটি এপ্রোন এবং এক জোড়া গ্লাভস পরে নিতে হবে।
৩. ডিসপোজেবল ওয়াইপ ব্যবহার না করলে, প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা অনুযায়ী বালতিতে পরিষ্কার পানি ও ডিটার্জেন্ট ব্যবহার করতে হবে।
৪. বিছানাটি সুবিধাজনক উচ্চতায় উঠাতে বাঁ নামাতে হবে।
৫. বিছানার ফ্রেম থেকে যেকোনো জিনিস সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে।
৬. উপর থেকে নীচের দিকে পরিষ্কার করার পর বেডের উপরের অংশগুলো তারপর পৃষ্ঠের প্রাপ্ত এবং
নীচের দিকগুলো পরিষ্কার করতে হবে।
৭. গদি পরিষ্কার করার সময়, একটি S-আকৃতিতে এবং অন্য আরেকটি কাপড় ব্যবহার করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। গদিটি ঘুরিয়েনাও এবং নীচের অংশটি পরিষ্কার করার পর সমস্ত প্রাপ্ত পরিষ্কার কর। ময়লা হয়েগেলে পরিষ্কার করার দ্রবণ এবং কাপড় পরিবর্তন করে গদিটি শুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর একটি জীবাণুনাশক দিয়ে সমস্ত পৃষ্ঠ মুছে ফেলতে হবে।
৮. বিছানা সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে বেডশিট বিছিয়ে বিছানাটিকে তার আসল অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে
৯. পরিষ্কার করার জন্য প্রবণ ব্যবহার করা হয়েছে তা ফেলে দিতে হবে।। এপ্রোন এবং গ্লাভস খুলে হাত আবারো ধুয়ে নিতে হবে।
১০. পরিষ্কারের সময় ও তারিখ চার্টে লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে।

ওয়াকার
একটি ওয়াকার বা হাঁটার ফ্রেম এমন একটি ডিভাইস যা হাঁটার সময় ভারসাম্য বা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অতিরিক্ত সহায়তা দেয়, সাধারণত বয়স-সম্পর্কিত গতিশীলতার অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধীতার কারণে। যারা পায়েৰা পিঠের আঘাত থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন তারা প্রায়ই ওয়াকার ব্যবহার করেন। এটি সাধারণত যারা হাঁটার সমস্যা বা হালকা ভারসাম্যের সমস্যা আছে তারা ব্যবহার করেন।
বিভিন্ন ধরনের ওয়ার
১. হাইব্রিত ওরাকার (Hybrid Walker):
একটি হাইব্রিড ওয়াকারে দুটি পা থাকে যা পার্শ্বীয় ভারসাম্য রক্ষায় সমর্থন দেয়। এটি ব্যবহারকারীকে এক বা দুই হাতে ব্যবহার করে, সামনে ও পাশে, পাশাপাশি একটি সিঁড়ি আরোহণের জন্য সামঞ্জস্যতা প্রদান করে।
২. রোস্টের (Rollator):
ওয়াকারের একটি ভিন্ন পদ্ধতি হ’ল রোলটর, যাকে ঢাকাযুক্ত ওয়াকারও বলা হয়। রোলেটরটিতে তিন বা চারটি বড়চাকা, হ্যান্ডেলবার এবং একটি ফ্রেম থাকে, যা ব্যবহারকারীকে সহজে চলাফেরার সাহায্য করে। এগুলোর উচ্চতা উঠা নামা করে ব্যবহারকারীর সুবিধা অনুযায়ী সামজস্য করা যায়। হ্যাভেলৰাৱে হ্যান্ডব্রেক আছে যার সাহায্যে রোলেটরটিকে তাৎক্ষণিকভাবে থামানো সম্ভব।
৩. জিনার ফ্রেন (Zimmer Frame) :
জিমার ফ্রেমটি হাঁটার সাহায্যের সবচেয়ে উপযোগী একটি ওয়াকার। জিমার ফ্রেমের সামনে দুটি ঢাকা আছে।


ওয়াকার ব্যবহারকারীর জন্য টিপস:
- ওয়াকার ব্যবহারকারীর নাম সংযুক্ত করা ভালো, যাতে এটি দুর্ঘটনাক্রমে হারিয়ে না যায়।
- একজন ওয়াকার ব্যবহারকারীর একজন সাহায্যকারী সঙ্গী আশেপাশে থাকা প্রয়োজন। যদি ওয়াকার ব্যবহারকারী তার ভারসাম্য, শক্তি বা ফোকাস হারায়, তাহলে তিনি সাহায্যকারী সঙ্গীর সাহায্য নিতে পারবেন।
- ব্যবহারকারীর সুবিধার্থে ওয়াকার একটি ঝুজি/ন্যাপ, ট্রে, টর্চলাইট বা অন্য কিছু নিয়েকাস্টমাইজ করা যায়
পরিচর্যা পদ্ধতি
১. সময়ের সাথে সাথে ওয়াকার বেশ নোংরা হতে পারে। এর ফলে অংশগুলো দ্রুত দীর্ণ হয়ে যেতে পারে। সপ্তাহে একবার সাবান এবং পানি দিয়ে ওয়াকার মুছতে হবে। ফ্রেম, চাকা, আসন এবং হ্যান্ডলগুলো পরিষ্কার করতে হবে। চাকাগুলো নিখুঁতভাবে ঘুরছে কিনা তা লক্ষ্য করতে হবে। ওয়াকার বৃষ্টিতে ভিজে গেলে দ্রুত শুকিয়েনিতে হবে।
২. যদি ওয়াকারে কোনো সিট থাকে, তা সপ্তাহে একদিন পরীক্ষা করে দেখতে হবে। নিরাপদে থাকার জন্য নিশ্চিত করতে হবে যে সিটটি ছিড়ে গিয়েছে কিনা তা পরীক্ষা কর।
৩. যদি ওয়াকারে কোনো চাকা থাকে, তাহলে খেয়াল রাখতে হবে যে তা চাকাগুলো সমানভাবে মাটিতে স্পর্শ করে কিনা। না করলে ওয়াকার মেরামত না করে ব্যবহার করা যাবে না। এই চাকাগুলো সঠিকভাবে সারিবদ্ধ না থাকলে সহজেই দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই কোনো সমস্যা হলে একজন সারভিসিং এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
৪. গ্রিপ পরীক্ষা করতে হবে। ওয়াকারের গ্রিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিপ নষ্ট হলে পরিবর্তন করতে হবে।
৫. ব্রেক হল রোলিং ওয়াকারের সবচেয়েগুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো সঠিকভাবে কাজ না করলে, ওয়াকার ব্যবহারকারী দুর্ঘটনার আক্রান্ত হতে পারেন।